MD. Mofizul Islam
April 10, 2026
Updated: April 15, 2026
1 min read
বিএনপি সরকারের গুম অধ্যাদেশ বাতিল: ফিরছে কি পুরোনো ‘ক্রসফায়ার’ ও অনিশ্চয়তার শঙ্কা?
Politics

দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ইউনূস সরকারের আমলে জারি করা ওই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটি বাতিলের পথে হাঁটছে, যা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। অনেকের মতে, এ সিদ্ধান্ত নতুন অশনি সংকেত বহন করছে।

ঢাকা, ৯ এপ্রিল, ২০২৬ – স্মৃতি এখনো তাজা। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোর প্রত্যাশা ছিল, শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার আসবেই। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সে আশা পূরণে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল—যেখানে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সেই পথচলা থেমে গেল নতুন সরকারের সিদ্ধান্তে।

দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ইউনূস সরকারের আমলে জারি করা ওই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটি বাতিলের পথে হাঁটছে, যা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। অনেকের মতে, এ সিদ্ধান্ত নতুন অশনি সংকেত বহন করছে।

দেশের আইন অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলো সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত হতে বাধ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি ৯৮টি আইনে রূপান্তর, ১৫টি সংশোধন ও বাকি ২০টি অনুমোদন না করার সুপারিশ করে

এই ২০টির মধ্যে ছিল গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধির অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আইনঅর্থাৎ, ১০ এপ্রিলের মধ্যে এগুলো সংসদে পাস না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে—যার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

বিএনপি অবশ্য সরকারের বিরুদ্ধে ‘গুম আইন বাতিলের’ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে। সংসদীয় দলের সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় দলীয় সিদ্ধান্ত হয়—গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিচার বিভাগ–সংশ্লিষ্ট চারটি অধ্যাদেশ ‘সংশোধনী ছাড়া পাস করা হলে নির্বাহী বিভাগের কার্যকরিতা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না’

আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারের পরিকল্পনা—এই অধ্যাদেশগুলো বর্তমানে পাস না করে ‘আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনা হবে’অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল নয়, তবে কার্যত তা আইনের মর্যাদা হারাচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘তারা (বিএনপি) গুরুত্বপূর্ণ ১০-১১টি অধ্যাদেশ সংসদে আনছে না। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ—এসব বাতিলের মধ্য দিয়ে তারা অনিয়ন্ত্রিত নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করতে চায়’

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই সিদ্ধান্ত গুমের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সুস্পষ্ট অন্যায়। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া ৬৮ শতাংশ জনগণের রায় এখানে উপেক্ষিত হয়েছে’

এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা গুম অধ্যাদেশ বাতিলের যুক্তি—‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের অনুমতি লাগবে’—প্রসঙ্গে কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘আইনের চোখে সবাই সমান, এই সাংবিধানিক নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এটি। এমন বিধান থাকলে গুমের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়’

📸 গ্যালারি

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ মহল এই সিদ্ধান্তকে কয়েকটি কারণে ‘গভীর উদ্বেগের’ বলে চিহ্নিত করেছেন:

১. পুরোনো ‘ক্রসফায়ার’ পর্বে ফেরার শঙ্কা: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ৪২ দিনে গুম বা ক্রসফায়ারের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। কিন্তু এই আইনী সুরক্ষা কাঠামো সরিয়ে নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পুরোনো ‘ক্রসফায়ার’ সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২. আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে পশ্চাদপসরণ: ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী কনভেনশনে সই করেছিল বাংলাদেশ। এই অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষায় প্রশ্ন উঠেছে।

৩. সংস্কার প্রক্রিয়ায় ভাটা: ইউনূস সরকারের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো হোঁচট খাচ্ছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, ‘আমলাতন্ত্রের পরামর্শেই বর্তমান সরকার এই সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চাইছে না’

৪. বিরোধী জোটের রাজপথে ফেরার হুঁশিয়ারি: এনসিপি ও অন্যান্য জোট ইতিমধ্যে ইউনূসসহ সাবেক উপদেষ্টাদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছে। রাজপথে ফেরা মানেই অস্থিতিশীলতা, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিএনপির দাবি, অধ্যাদেশগুলো ‘বাতিল’ নয়, বরং ‘আরও পরিপক্ব ও শক্তিশালী করে নতুন আইন’ আনা হবে। বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বিবিসিকে জানান, ‘সবগুলো অধ্যাদেশ আলোচনা করেই এই সুপারিশ করা হয়েছে’

তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইনবিদদের একাংশ মনে করেন, ‘পরে আরও শক্তিশালী আইন’ করার ঘোষণা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বা খসড়ার প্রতিশ্রুতি না থাকায় তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকার আশঙ্কা থেকেই যায়।

দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের এই প্রথম বড় সিদ্ধান্তটি দেখিয়ে দিচ্ছে, স্মৃতি ও প্রতিশ্রুতির মাঝে কখনো কখনো প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গুমপ্রত্যাশী পরিবারগুলোর অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আর সেটাই যেন নতুন অশনি সংকেত।

মন্তব্যসমূহ

এখনও কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

একটি মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ

সংযুক্ত থাকুন

জনপ্রিয় খবর

সক্রিয় ব্যবহারকারী জন