MD. Mofizul Islam
February 13, 2026
Updated: April 15, 2026
1 min read
ভোটের মাঠে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’–এর অভিযোগ: টাকা, ব্যালট ছিনতাই ও ফল কারসাজির মহোৎসব
Election Rigging

ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার কেনা, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও ফলাফল কারসাজির এক অভূতপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে। গতকাল অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ দাবি করলেও একাধিক রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সংগঠন নির্বাচনী কারসাজি বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর তীব্র অভিযোগ এনেছে ।

ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার কেনা, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও ফলাফল কারসাজির এক অভূতপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে। গতকাল অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ দাবি করলেও একাধিক রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সংগঠন নির্বাচনী কারসাজি বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর তীব্র অভিযোগ এনেছে ।

দেশের ২৯৯টি আসনে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ শেষে রাত থেকেই ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন দাবি করেছেন, “দেশের ইতিহাসে এই নির্বাচন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর” । কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে শুরু করে ভোলা, শরীয়তপুর, নোয়াখালী ও কুমিল্লা—সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে কারচুপি, সহিংসতা ও অনিয়মের ছায়া ।

ভোটার কেনার অপকৌশল: টাকা ও পরকাল

সর্বাধিক আলোচনায় আসা পদ্ধতি হলো সরাসরি অর্থের বিনিময়ে ভোট সংগ্রহ। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের রনশাল গ্রামে ভোট চলাকালে জামায়াত-ই-ইসলামীর নেতা জয়নাল আবেদীনকে ভোটারদের মধ্যে নগদ টাকা বিতরণ করতে গিয়ে হাতেনাতে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারেক আজিজ তাকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করেন ।

কিন্তু একক এই ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংহত পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। জামায়াত-ই-ইসলামী দেশব্যাপী ‘গোপন প্যামফ্লেট’ বিতরণ করে ভোটারদের ১৫ হাজার টাকা ও ‘পরকাল পাপমুক্ত জীবনের’ প্রলোভন দেখিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই লিফলেটে ভোটারদের ব্যালটে ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কায় ভোট দিয়ে তার ছবি তুলে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিকাশ বা নগদ মাধ্যমে সেই টাকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। প্যামফ্লেটে লেখা ছিল, “আল্লাহকে সাক্ষী রেখে এই লিফলেট সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে” ।

ব্যালট ছিনতাই ও সহিংসতা: মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চিত্র

ভোলা-১ (সদর) আসনের আলীনগর স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে শুধু অনিয়ম নয়, ঘটেছে সশস্ত্র তাণ্ডব। দুর্বৃত্তরা দেশীয় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। তারা প্রিজাইডিং অফিসার ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালিয়ে ৫৬টি ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয় এবং আরও ৭৬টি ব্যালটে জাল ভোট প্রদান করে। এই ঘটনায় প্রায় সোয়া ঘণ্টা ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয় ।

নোয়াখালী-৬ আসনে ভোটের আগের রাতেই ‘রক্তাক্ত সংঘর্ষের’ ঘটনা ঘটেছে বলে জামায়াত নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল অভিযোগ করেন। একই চিত্র ঝালকাঠি ও শরীয়তপুরেও। এসব এলাকায় জামায়াতের কর্মীদের কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ।

ফলাফল কারসাজি: মিডিয়ার মাধ্যমে ‘ন্যারেটিভ’ বদল?

ভোট গণনা শেষ হতে না হতেই ফল কারসাজির নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ শজীব ভূঁইয়া গভীর রাতে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, “গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগসাজশে ফলাফলে কারসাজির চক্রান্ত চলছে।” 

এনসিপির দাবি, ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাসকে জেতাতে ‘বাতিল ভোট’ গণনা করে জেতানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আসিফ মাহমুদ আব্বাসের ভাতিজার ফোনালাপের রেকর্ডিংও প্রচার করেন, যদিও এর সত্যতা যাচাই করেনি নির্বাচন কমিশন ।

ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ফেসবুকে জয়ের ঘোষণা দিয়ে ফলাফল ঘুরিয়ে দেওয়ার চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা-১৭ আসনে ৫০টি কেন্দ্রের ফল না আসতেই এক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় বলে এনসিপি দাবি করেছে ।

📸 গ্যালারি

নির্বাচন কমিশন: অসহায় না নীরব?

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বারবার দাবি করেছেন, “যে ফলাফল রিটার্নিং অফিসার স্বাক্ষর করে আনবেন, শুধু সেটাই গণ্য হবে। কোনো অনানুষ্ঠানিক বা অযাচাইকৃত ফল গ্রহণযোগ্য নয়” । তিনি ভোটারের উপস্থিতির হার নিয়ে কারসাজির অভিযোগও নাকচ করে দিয়েছেন ।

কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে চরম দুর্বলতা দেখিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের অংশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।” 

টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারীরা আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও গণভোটের পক্ষে প্রচারে তাদের নামানো হয়, যা নির্বাচন কমিশনের নীরব সম্মতিতেই হয়েছে ।

ভোটার টার্নআউট: যে রহস্য উন্মোচন হয়নি

দুপুর ২টায় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, ৩৬ হাজার ৩১টি কেন্দ্রের তথ্যে ভোট পড়েছে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সার্বিক ভোটারের উপস্থিতির হার কত ছিল, তা আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশ করেনি কমিশন। সিইসি সংবাদ সম্মেলনে এসে শুধু বলেছেন, “পূর্ববর্তী নির্বাচনেও এ নিয়ে বিতর্ক ছিল। দয়া করে এখন প্রশ্ন করবেন না।” 

দৃষ্টিভঙ্গি: নির্বাচন-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত-ই-ইসলামী জোট উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে এগিয়ে থাকলেও যে পরিমাণ অভিযোগ এসেছে, তা নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে । জামায়াতের ১১-দলীয় জোট শতাধিক ভিডিও প্রমাণসহ কমিশনে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে ।

সিইসি দাবি করলেও, স্বাধীন সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন ভিন্ন। টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, “জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও জুলাই চার্টার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র সংস্কারের বিকল্প নেই। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত শক্তিশালীকরণ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।” 

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদেশে অবস্থিত ভোটারদের জন্য ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । প্রযুক্তির এই প্রয়োগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রের তথ্য একত্র করতে গিয়ে যেন পুরোনো সেই অভিশাপ—অনিয়ম, দালালি ও প্রশাসনিক পক্ষপাত—আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন যতবার স্বচ্ছতার কথা বলছে, ততবারই ঘটনাস্থল ও বিরোধী দলগুলোর তরফ থেকে উঠছে কারচুপির সুর ।

সবশেষ প্রশ্নটি রয়েই যায়—এই ভোট কি সত্যিই ছিল গণতন্ত্রের পথে যাত্রা, নাকি পুরোনো পদ্ধতিতে নতুন নামাঙ্কিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মহড়া?

শেয়ার করুন:
MD. Mofizul Islam

MD. Mofizul Islam

Expert in election engineering in bangladesh news with 1 articles published.

মন্তব্যসমূহ

এখনও কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

একটি মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ

সংযুক্ত থাকুন

জনপ্রিয় খবর

সক্রিয় ব্যবহারকারী জন