MD. Mofizul Islam
February 21, 2026
Updated: April 13, 2026
1 min read
১৪ বছর ধরে বিচারহীনতার গ্লানি: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের অমীমাংসিত রহস্য
Investigations

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি । তাদের একমাত্র ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ, যে তখন পাঁচ বছরের শিশু, তার চোখের সামনে ঘটে যায় এই বর্বর হত্যাকাণ্ড । চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেলেও এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার কাঙ্ক্ষিত সমাধান আজও অধরা। এই দীর্ঘ সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে ১২৩ বারেরও বেশি ।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি । তাদের একমাত্র ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ, যে তখন পাঁচ বছরের শিশু, তার চোখের সামনে ঘটে যায় এই বর্বর হত্যাকাণ্ড । চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেলেও এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার কাঙ্ক্ষিত সমাধান আজও অধরা। এই দীর্ঘ সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে ১২৩ বারেরও বেশি ।

ঘটনার পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন । প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও চার দিন পর মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয় । ডিবি ৬২ দিন তদন্ত করে ব্যর্থতা স্বীকার করলে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার দায়িত্ব পায় র ্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র ্যাব) ।

র ্যাব তদন্তে নেমে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। সাগর-রুনির মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় । ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত—হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, সাগরের মোজা ও প্যান্ট, রুনির টি-শার্টসহ বেশ কিছু জিনিস—পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয় । ওই পরীক্ষায় অজ্ঞাত দুই ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত হয় । পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার আটজনের ডিএনএ নমুনাও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়, কিন্তু কারও সঙ্গেই অজ্ঞাত那两个 ব্যক্তির ডিএনএ মেলেনি ।

তদন্তের ধারা বারবার বদলেছে। কখনও গ্রেপ্তার হয়েছে রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান, বাসার দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল ও এনামুল হক ওরফে হুমায়ূন । পরে ডাকাত মামলার কয়েকজন আসামিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু কাউকে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় আটজনের মধ্যে দুজন জামিনে এবং বাকি ছয়জন কারাগারে রয়েছেন । পলাতক দারোয়ান এনামুলকে ধরতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেও লাভ হয়নি ।

দীর্ঘ ১২ বছর তদন্তের পর র ্যাবের ব্যর্থতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেন, 'দীর্ঘদিনেও তদন্ত শেষ না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। এতে শুধু সাগর-রুনির পরিবার নয়, পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে' । একই সাথে আদালত মামলাটি র ্যাব থেকে সরিয়ে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দেন এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন ।

📸 গ্যালারি

সেই নির্দেশনার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে র ্যাবের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র বুঝে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) । পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হকের নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয় । নতুন করে তদন্ত শুরু হলেও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছানোর ধারা থামেনি। হাইকোর্টের নির্ধারিত সময় শেষ হলে রাষ্ট্রপক্ষ আরও নয় মাস সময় চায় এবং আদালত ছয় মাস সময় দেয় । ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের খবর অনুযায়ী, ১২১ বারের মতো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়ে ৩০ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয় । সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্যমতে, এটি ১২৩ বারে পৌঁছেছে ।

বারবার তারিখ পিছানোর ঘটনায় হতাশ নিহতের পরিবার। সাগরের মা সালেহা মুনির এক সংবাদমাধ্যমকে слезভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, 'আমার ছেলেকে হত্যার বিচার আর এই দেশে হবে না। কিন্তু এই আসমান-জমিন যতদিন থাকবে, আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিনই সাগর হত্যার বিচার চাইবো। আমি শুধু জানতে চাই, আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল। কেন আমার একমাত্র সন্তানকে হত্যা করে আমার বুক খালি করা হলো' ।

মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমানও বারবার হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'তদন্তে গাফিলতির কারণে বারবার এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে। বলতে গেলে এই মামলার আজ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতিই দেখলাম না' ।

চৌদ্দ বছরের পথচলায় শুধু তারিখ পিছানো আর তদন্ত সংস্থা বদলানো ছাড়া এই মামলার যে কংক্রিট কোনো অগ্রগতি নেই, তা আজ স্পষ্ট। একটি সন্তানহারা মায়ের слеза, একটি এতিম শিশুর অবহেলিত শৈশব আর বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের বারবার প্রতারিত হওয়ার ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠায়। টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কি আলোর মুখ দেখবে এই হত্যাকাণ্ড? নাকি এটিও দেশের অন্যান্য আলোচিত হত্যা মামলার মতো বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাবে? সময়ই উত্তর দেবে। কিন্তু প্রতিটি পিছিয়ে যাওয়া তারিখের সাথে সাথে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাটাই যেন আরও দূরে সরে যাচ্ছে।


মন্তব্যসমূহ

এখনও কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

একটি মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ

সংযুক্ত থাকুন

জনপ্রিয় খবর

সক্রিয় ব্যবহারকারী জন