Skip to content
Independent. Investigative. In the public interest.
LoginRegisterJoin the newsroom EN বাংলা
JulyTimes
Newsletter

চতুর্মুখী চাপের মুখে বাংলাদেশ: সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব সংকট কতটা গভীর?

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ নতুন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ...

Reader tools
চতুর্মুখী চাপের মুখে বাংলাদেশ: সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব সংকট কতটা গভীর?

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ নতুন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রটি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বৈদেশিক চাপের এমন এক মিশ্রণে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা তার সার্বভৌমত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু সীমানা ঘেঁষা প্রতিবেশী নয়; বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি, আঞ্চলিক সামরিক জোট এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার জটিল শৃঙ্খল বাংলাদেশকে একটি অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রত্যাবর্তন ও ইসলামী মডেলের পুনর্বাসন

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের পুনরাগমন সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন। ১৯৭১-এর পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি নৌযান ভিড়েছে, যা শুধু প্রতীকী নয়, বরং গভীর কৌশলগত তাৎপর্য বহন করে । বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইসলামী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি অব্যাহত ছাড় দেওয়া এবং জামায়াত-ই-ইসলামির পুনর্বাসন পাকিস্তানি স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ রয়েছে ।

পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্কও এই সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, রিয়াদ ইসলামাবাদের পারমাণবিক ছত্রছায়ায় আশ্রয় খুঁজছে, যা সরাসরি বাংলাদেশের জন্যই হুমকি। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও চরমপন্থা রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে, যা আফগানিস্তানের পর বাংলাদেশকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে ।

মহাশক্তির দাবা খেলা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে রয়েছে একটি দ্বিধাবিভক্ত কৌশল। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস যখন চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে বেইজিং সফর করছেন এবং স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজ বাতিল করছেন, অপরদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আতিথ্য দিচ্ছেন এবং চীনা অস্ত্রের পরিবর্তে আমেরিকান অস্ত্র আমদানির আগ্রহ দেখাচ্ছেন ।

এই বিভক্ত নেতৃত্বের ফলাফল হচ্ছে একটি অনমনীয় ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন। চীন ইতোমধ্যেই চট্টগ্রামের কাছে একটি বিশাল সাবমেরিন ও নৌঘাঁটি নির্মাণ করেছে, যা বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড় । অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলে বাংলাদেশকে চীন প্রতিরোধের একটি ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রশাসনের আমলে ইউএসএইডের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের স্পষ্ট উদাহরণ ।

প্রতিবেশী ভারত: আস্থা ও অস্বস্তির দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভারত প্রসঙ্গ অনিবার্য। একটি বিরাট ও শক্তিশালী প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে যেমন আস্থা রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর অস্বস্তিও। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস ভারতীয় প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি "ষড়যন্ত্রের" কথা উল্লেখ করে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন ।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি আঞ্চলিক ও একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, যার সবকটিই বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য সমান ক্ষতিকর । ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সন্ত্রাসবাদ স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন । পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অনুপ্রবেশের মতো পুরোনো বিষয়গুলো নতুন করে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক করিডোর না ভূরাজনৈতিক ট্রোজান হর্স?

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য নতুন এক মাত্রার হুমকি তৈরি করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম-রাখাইন মানবিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে তা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের পথ খুললেও, এর সাথে ঝুঁকিও কম নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সিরিয়া, লিবিয়া ও আফগানিস্তানে মানবিক করিডোর বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অস্ত্র পাচারের পাইপলাইনে পরিণত হয়েছিল ।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) তৎপরতা এবং কিছু আন্তর্জাতিক এনজিওর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শ উপেক্ষা করে এ ধরনের করিডোর বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে ।

অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও সেনাবাহিনীর সতর্কবার্তা

বৈদেশিক হুমকি তখনই সফল হয়, যখন রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সেই দুর্বলতাকেই চিহ্নিত করে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য একটি স্পষ্ট হুমকি দেখতে পাচ্ছেন । আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবলহীনতা এবং বিচার বিভাগীয় তৎপরতার কারণে পুলিশ কাজ করতে ভয় পাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সেনাশাসন পুনর্বহালের পথ তৈরি করে দিচ্ছে ।

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্বের ফল নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আস্থা সংকট। পাকিস্তানের চরমপন্থী মডেল থেকে শুরু করে মার্কিন-চীনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারতের সাথে জটিল সম্পর্ক এবং মিয়ানমারের সীমান্তে সৃষ্ট নতুন ফাঁদ—সব মিলিয়ে দেশটি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে শুধু সীমান্ত প্রহরা নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ এবং বৈদেশি শক্তির প্রতি সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ না করলে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য।

Request a correction or reply
1reading now