MD. Mofizul Islam
February 23, 2026
Updated: April 13, 2026
1 min read
শিরোনাম: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: বিএনপি কি পারবে?
Politics

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু সরকার গঠনের শুরুতেই জটিলতা তৈরি হয়েছে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে। ১৭ই ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন; তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে যে সংকটের সূত্রপাত হয়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠেছে—বিএনপি কি সত্যিই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু সরকার গঠনের শুরুতেই জটিলতা তৈরি হয়েছে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে। ১৭ই ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন; তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে যে সংকটের সূত্রপাত হয়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠেছে—বিএনপি কি সত্যিই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে?

জুলাই সনদের পথ পরিক্রমা বেশ জটিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে বিএনপি-জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট সই করে । এই সনদের ভিত্তিতে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দেন । গণভোটের এই ফলাফলকে সামনে রেখেই ১৭ই ফেব্রুয়ারি একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন।

বিএনপি কেন এই দ্বৈত শপথ এড়িয়ে গেল? দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই এবং এই পরিষদের সদস্যদের শপথের কোনো বিধান সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত নয় । শপথ গ্রহণের আগে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের ফরম সংবিধানে যুক্ত হলে এবং কে শপথ পড়াবেন তা নির্ধারিত হলে তখন তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন । সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এই অবস্থানকে সমর্থন করে বলেছেন, ‘‘সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু না থাকায় বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি’’ ।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র ৭৭ জন সংসদ সদস্য উভয় শপথই গ্রহণ করেন । ফলে এখন জামায়াত-এনসিপি জোটের দাবি, তারা চাইলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে কাজ করতে পারেন, কারণ এই পরিষদের কোরাম মাত্র ৬০ জন । এনসিপির নেতারা বিএনপির এই পদক্ষেপকে ‘গণভোটের জনরায়ের সাথে প্রতারণা’ ও ‘জুলাই সনদের সাথে গাদ্দারি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন । জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘বিএনপি যদি দুটি শপথ না নেয়, তাহলে সংসদে যাওয়াই বা অর্থহীন’’ ।

আইনি বিশ্লেষকদের মধ্যেও এই ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনিরের মতে, ‘‘বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ধারা ৮ ও তফসিল লঙ্ঘন করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিও এটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল’’ । অপরদিকে ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, ‘‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণাটিই মূল্যহীন, কারণ সংসদই সংবিধান সংস্কার করতে পারে’’ । তিনি গণভোটের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘গণভোটের মাধ্যমেই যদি সংস্কার হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ লাগবে কেন?’’ ।

জটিলতা আরও বাড়িয়েছে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট । এই মামলার মাধ্যমে বিএনপি পরোক্ষভাবে গণভোটের ফলাফলকে বিতর্কিত করে তুলতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে । এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিজেই আইনি প্রশ্নের সম্মুখীন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেছেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নামে এই আদেশ জারি করার কোনো এখতিয়ার নেই। সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন এভাবে আদেশ দিয়ে করা যায় না’’ ।

📸 গ্যালারি

জুলাই সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব। সনদে প্রধানমন্ত্রী ও দলপ্রধান পদ পৃথকীকরণ, উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের মতো প্রস্তাব রয়েছে । আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৮৯ সালের অষ্টম সংশোধনী মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েও পরিবর্তন করা যাবে না । এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকার ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ বা মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পথ বেছে নিয়েছিল । কিন্তু বিএনপি এখন সেই পথই বন্ধ করে দিচ্ছে।

প্রথম আলোর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘‘বিএনপি যেহেতু জুলাই সনদে সই করেছে, তাই তাদের দেওয়া ভিন্নমতগুলো বাদ দিয়ে হলেও জুলাই সনদের বাকি সবকিছু বাস্তবায়নের নৈতিক বাধ্যবাধকতা দলটির রয়েছে’’ । কিন্তু সমস্যা হলো, বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতগুলো বাদ দিলেও জুলাই সনদের মূল কাঠামো অক্ষত থাকে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেমন ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতির আওতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দলীয় প্রধানের পদ ছাড়তে হবে —এই সিদ্ধান্ত কি বিএনপি মেনে নেবে? দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এরই মধ্যে জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমানের নাম আলোচনায় এসেছে ।

বাস্তবতা হলো, বিএনপির কাছে এখন তিনটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, তারা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে নিজেরাই সংবিধান সংশোধন করে জুলাই সনদের কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তৃতীয়ত, তারা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে জামায়াত-এনসিপির সাথে আলোচনায় বসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে পারে ।

তবে আইন বিশ্লেষক ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, ‘‘জনগণ সংবিধানেরও উপরে। জনগণ চাইলে সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান করতে পারে’’ । গণভোটে জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দেওয়ায় এই যুক্তি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বিএনপিও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তাই এখন দেখার বিষয়, এই দুই জনমতের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে ঘটে।

সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে আইনি জটিলতা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিভক্তি—নানাবিধ বাধা বিএনপির সামনে। সরকার গঠনের শুরুতেই জামায়াত-এনসিপির সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। এখন বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদকে এড়িয়ে যাবে, নাকি অভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে সনদ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে আসবে। এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না।

শেয়ার করুন:
MD. Mofizul Islam

MD. Mofizul Islam

Expert in BNP news with 1 articles published.

MD. Mofizul Islam

MD. Mofizul Islam

Expert in Bangladesh Politics news with 1 articles published.

MD. Mofizul Islam

MD. Mofizul Islam

Expert in election 2026 news with 1 articles published.

মন্তব্যসমূহ

এখনও কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

একটি মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ

সংযুক্ত থাকুন

জনপ্রিয় খবর

সক্রিয় ব্যবহারকারী জন